দুই সন্তান হারানো মায়ের আকুতি
“যে তার সন্তানদের মেরে ফেলে সে বাবা না, তার ফাঁসি হোক”
- আপলোড সময় : ১৪-০৮-২০২৬ ০৮:০০:৪২ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৪-০৮-২০২৬ ০৮:০০:৪২ পূর্বাহ্ন
বিশেষ প্রতিনিধি ::
“এমন স্বামীর চেহারা জীবনেও দেখতাম না। চাইতামও না। যে তার সন্তানদের মেরে ফেলে সে বাবা না। আমার দুই সন্তানকে যে এভাবে মেরে ফেলেছে, আমার বুক খালি করছে। তার ফাঁসি হোক। কান্নায় ভেঙে পড়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন দিরাই উপজেলার পেরুয়া মধুপুর গ্রামের দুই সন্তান হারানো মা আফরোজা আক্তার।
দুই সন্তানকে হারিয়ে এখন নিঃস্ব এই মা। ঘরের এক কোণে পড়ে আছে ছয় বছরের মুহাদ্দিস ও সাড়ে তিন বছরের তুলনার জামাকাপড় ও খেলনা। সেগুলো দেখেই বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি।
আফরোজা বলেন, আমি তো জানতামই না, সে কখন সন্তানদের নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছে। ঘরে এসে যখন দেখি আমার সন্তানরা নেই, তখন অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি। এলাকাবাসীও তাদের খুঁজেছে। কিন্তু কোথাও পাইনি। কখনো ভাবিনি, নিজের বাবাই তাদের এভাবে মেরে ফেলেছে।
তিনি আরও বলেন, ওরা তার কি ক্ষতি করছে। ভালা না লাগলে আমারে বলতো আমি তাদের নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যেতাম। এভাবে আমার বাচ্চাদের কেন মারলো। যে বাবা সন্তানদের নিরাপদে রাখার কথা, সেই বাবাই তাদের মেরে ফেলেছে। আমি এর বিচার চাই, তার ফাঁসি চাই।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার মায়ের অগোচরে দুই সন্তানকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন কামরুল হাসান। পরে সন্তানদের ঘরে না পেয়ে মা ও পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। খবর পেয়ে স্থানীয়রাও বিভিন্ন জায়গায় তাদের সন্ধান করেন। কিন্তু কোনো সন্ধান মেলেনি। দুই দিন পর রোববার সিলেট থেকে বাড়ি ফেরার পথে প্রথমে বড়কাপন এলাকায় ঘুমন্ত মেয়ে তুলনাকে হাওরে ফেলে দেন কামরুল। পরে দিরাই রাস্তা সংলগ্ন দেখার হাওরে ফেলে দেন ছেলে মুহাদ্দিসকে।
পুলিশকে কামরুল জানান, দুই শিশুকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল। সন্তানদের হত্যার পর নিজেকে আড়াল করতে নিখোঁজের নাটক সাজান তিনি। বাড়ি ফিরে সন্তানদের নিখোঁজ দেখিয়ে ফেসবুকে লাইভও করেন কামরুল। এরপর প্রায় ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে শান্তিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দুই হাওর থেকে ভেসে ওঠে দুই শিশুর মরদেহ। পুলিশ মরদেহ দুটি উদ্ধার করে। পরে পরিচয় শনাক্ত হয় মুহাদ্দিস ও তুলনার। মরদেহ উদ্ধারের পর সন্দেহ হলে স্থানীয়রা কামরুলকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দুই সন্তানকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে তিনি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে, সন্তান হারিয়ে এখন শোক আর ক্ষোভে পুড়ছেন মা আফরোজা। দুই শিশুর মৃত্যুতে দিরাইসহ পুরো সুনামগঞ্জে নেমেছে শোকের ছায়া। এলাকাবাসীর দাবি ঘাতক কামরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, যাতে এমন নির্মম ঘটনা আর কোনো পরিবারকে দেখতে না হয়।
এ ব্যাপারে দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কামরুল দুই সন্তানকে হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেছে। এ ঘটনায় শান্তিগঞ্জ থানায় মামলা হয়েছে। তাকে শান্তিগঞ্জ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. অলিউল্লাহ বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও স্পর্শকাতর। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, নিহত দুই শিশুকে তাদের বাবা গত ৭ আগস্ট বাড়ি থেকে ঘোরানোর কথা বলে নিয়ে যান। পরবর্তীতে পৃথক দুটি স্থান থেকে শিশু দুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওসি আরও বলেন, এ ঘটনায় অভিযুক্ত কামরুল জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। হত্যাকা-ের প্রকৃত কারণ, এর পেছনে পূর্বপরিকল্পনা ছিল কি না এবং অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না - এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এ ঘটনায় নিহত শিশু দুটির মা বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেছেন। তদন্তে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

বিশেষ প্রতিনিধি